সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট : মোঃ সাইফুল ইসলাম এম.এ (ফিলোসোফি)
মোবাইলঃ 01714339019
—————————————————————-
ভূমিকা:
শিক্ষার শাশ্বত নির্যাস যখন পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে 'পণ্য' হিসেবে বিপণনযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন একটি জাতির আত্মিক ও বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড ক্ষয়িষ্ণু হতে শুরু করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কর্তৃক ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ঘোষিত "কোচিং সেন্টার শতভাগ বন্ধ করতে হবে" শীর্ষক অঙ্গীকারটি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় চেতনার মূলে প্রোথিত এক অশুভ সংকর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শাণিত বিদ্রোহ। যখন জ্ঞানের পবিত্র আধার'শ্রেণিকক্ষ'গৌণ হয়ে যায় এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম 'শিট' ও 'সাজেশন' শিক্ষার্থীর মেধার দিগন্তকে রুদ্ধ করে ফেলে, তখন জাতির সৃজনশীল অপমৃত্যু অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবন্ধের অভীষ্ট হলো সেই বাণিজ্যিক কৃষ্ণগহ্বর থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করে এক ঋদ্ধ, বৈষম্যহীন এবং স্বচ্ছ জ্ঞানতাত্ত্বিক বাতাবরণ সৃষ্টির পথরেখা অঙ্কন করা। আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রজন্মের চাহিদার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে একটি মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণই এখন সময়ের প্রধান দাবি এবং জাতীয় লক্ষ্য। কোচিং বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে বিদ্যালয়ের প্রাণস্পন্দন ফিরিয়ে আনাই হবে এই সংগ্রামের মূল ভিত্তি। প্রাজ্ঞিক এই রূপান্তর কেবল আইনের প্রয়োগে নয়, বরং চেতনার জাগরণে সম্ভব হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বকীয়তা বজায় রেখে তাকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যোগ্য করে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
> তত্ত্ব ও তথ্যসূত্র: ৪ এপ্রিল ২০২৬, কুমিল্লায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা দেশের সকল শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনাম হিসেবে স্থান পায়। (সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক শিক্ষা)।
জেন-জেড প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব : কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থার স্বরূপ
বর্তমান যুগের শিক্ষার্থীরা মূলত 'জেন-জেড' (Gen Z) বা ডিজিটাল পৃথিবীর আদিবাসী, যাদের চিন্তার জগৎ ও জীবনদর্শন পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বৈচিত্র্যময়। এই প্রজন্মের মেন্টালিটি বা মনস্তত্ত্ব মূলত তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রাপ্তি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সৃজনশীল আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। তারা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা চায় যা কেবল চার দেয়ালের তাত্ত্বিক লেকচারে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনের জটিলতা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। জেন-জেড শিক্ষার্থীরা গৎবাঁধা মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে 'কেন' এবং 'কীভাবে'—এই দুই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেশি আগ্রহী ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাদের জন্য এমন এক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা উচিত যেখানে পাঠ্যবই হবে কেবল একটি নির্দেশিকা, আর বাস্তব জগত হবে তাদের প্রকৃত গবেষণাগার। ডিজিটাল প্রযুক্তির নিবিড় সান্নিধ্যে বড় হওয়া এই প্রজন্ম তথ্যের চেয়ে তথ্যের বিশ্লেষণ ও প্রায়োগিক দক্ষতাকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। শিক্ষকরা যদি তাদের এই বৈশ্বিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান না করেন, তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে একটি নিছক কারাগার হিসেবেই গণ্য হবে। তাই তাদের জন্য প্রয়োজন এমন একটি 'লার্নিং ইকোসিস্টেম' যা তাদের কৌতূহলকে উদ্দীপিত করবে এবং নিজস্ব সত্তাকে বিকশিত করার অবারিত সুযোগ দেবে। জেন-জেড প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করে সহানুভূতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক পাঠদানই হতে পারে আধুনিক শিক্ষার মূল ভিত্তি ও চালিকাশক্তি। এই প্রজন্মের জন্য প্রজেক্ট-বেসড লার্নিং এবং দলগত সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি প্রবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি ও অপরিহার্য।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সংস্কারের অন্তরায়: উপাচার্যের পর্যবেক্ষণ
শিক্ষা সংস্কারের পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ও অনমনীয় 'আমলাতান্ত্রিক জটিলতা', যা প্রকৃত পরিবর্তনকে বারবার ব্যাহত করছে। গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য তাঁর এক দূরদর্শী ভিডিও বার্তায় অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই প্রশাসনিক সংকটের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, শিক্ষার আধুনিকায়ন ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনসমূহ যখনই আমলাতন্ত্রের টেবিলে পৌঁছায়, তখনই তা ফাইলবন্দী হয়ে স্থবির হয়ে পড়ে। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অনেক সময় এমন ব্যক্তিদের আধিপত্য দেখা যায় যাদের সাথে বর্তমানের আধুনিক শ্রেণিকক্ষের কোনো সরাসরি যোগাযোগ বা সম্পৃক্ততা নেই। উপাচার্য মহোদয় দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, শিক্ষাকে আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে প্রকৃত শিক্ষাবিদদের হাতে এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সঁপে দিতে হবে। কোচিং বন্ধের এই মহাপরিকল্পনা সফল করতে হলে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে দ্রুত ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমলাতন্ত্রের সংকীর্ণতা অনেক সময় শিক্ষকদের সৃজনশীলতাকেও আচ্ছন্ন করে ফেলে, যা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক অশনি সংকেত। যদি প্রশাসনিক স্তরে এই স্থবিরতা দূর না হয়, তবে শিক্ষামন্ত্রীর মহৎ উদ্দেশ্য কেবল কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন একটি গতিশীল ও স্বয়ংক্রিয় প্রশাসনিক কাঠামো যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘ সময় অপচয় হবে না। তাই আমলাতন্ত্রের বদলে শিক্ষাকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হোক আমাদের আগামীর শিক্ষা সংস্কারের মূলমন্ত্র ও প্রধান লক্ষ্য।
> তত্ত্ব ও তথ্যসূত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভিডিও বার্তা, মার্চ ২০২৬ (ইউটিউব চ্যানেল ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট জার্নাল)।
শ্রেণিকক্ষের আধুনিকায়ন: ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল বোর্ডের বিপ্লব
শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের মোহ থেকে সরিয়ে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার প্রধান শর্ত হলো শ্রেণিকক্ষকে আধুনিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠতম আধার হিসেবে গড়ে তোলা। বর্তমানে ব্যবহৃত সেকেলে প্রজেক্টর বা সাদা বোর্ড পদ্ধতি জেন-জেড প্রজন্মের দৃশ্যমান ও ইন্টারঅ্যাক্টিভ শিক্ষার চাহিদাকে পূরণ করতে অপার্থিবভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে হাই-ডেফিনিশন ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল বোর্ড স্থাপন করা এখন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি মৌলিক ও অনিবার্য প্রয়োজন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক কেবল নিরস তাত্ত্বিক আলোচনা করবেন না, বরং থ্রি-ডি সিমুলেশন ও অগমেন্টেড রিয়ালিটির মাধ্যমে জটিল বিজ্ঞান বা জ্যামিতি জীবন্ত করে তুলবেন। যখন পাঠ্যবইয়ের জীর্ণ অক্ষরগুলো ডিজিটাল বোর্ডে চলমান চিত্রে রূপান্তরিত হবে, তখন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষেই এক জাদুকরী ও আনন্দময় শিখন অভিজ্ঞতা লাভ করবে। কোচিং সেন্টারের কৃত্রিম লেকচার শিট তখন এই ডিজিটাল ও ইন্টারঅ্যাক্টিভ অভিজ্ঞতার কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ এবং সেকেলে বলে প্রতিপন্ন হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হওয়ার হার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং পড়াশোনার প্রতি তাদের এক নতুন অনুরাগ সৃষ্টি হবে। শিক্ষকদের ডিজিটাল বোর্ডে কন্টেন্ট তৈরির দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শ্রেণিকক্ষ যখন একটি অত্যাধুনিক লার্নিং স্টুডিওতে পরিণত হবে, তখন শিক্ষা হবে একটি আনন্দযাত্রা—কোনো ক্লান্তিকর বা একঘেয়ে যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এই প্রযুক্তির মেলবন্ধনই হবে কোচিং বাণিজ্যের কফিনে শেষ পেরেক এবং আধুনিক স্মার্ট বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান সোপান।
মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা ও এআই (AI) এর ভূমিকা
শিক্ষার গুণগত মান ও পবিত্রতা রক্ষা করতে হলে মূল্যায়নের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক একটি শর্ত। অনেক সময় শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব, অবহেলা কিংবা খাতা না পড়ার কারণে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা চরম বৈষম্য ও মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়। এই মানবিক সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক ত্রুটি সংশোধনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI প্রযুক্তি বর্তমানে এক অসামান্য ও বৈপ্লবিক সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শিক্ষকের মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তরপত্রটি স্ক্যান করে দেখবে যে উত্তরের মান ও প্রাপ্ত নম্বরের মধ্যে কোনো অসংগতি আছে কি না। এতে 'হ্যালো ইফেক্ট' বা পূর্বনির্ধারিত ধারণার বশবর্তী হয়ে নম্বর প্রদানের কুপ্রথা চিরতরে বন্ধ হবে এবং মূল্যায়নে এক স্বচ্ছ ভারসাম্য বজায় থাকবে। অজ্ঞাতনামা ডিজিটাল গ্রেডিং পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নাম-পরিচয় গোপন রেখে খাতা মূল্যায়ন করলে শিক্ষকের পক্ষে কোনো বিশেষ শিক্ষার্থীর প্রতি অনুকম্পা দেখানো অসম্ভব হবে। প্রযুক্তি যখন পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে, তখন শিক্ষকরাও উত্তরপত্র মূল্যায়নে অধিকতর সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হবেন। পক্ষপাতদুষ্ট মূল্যায়ন ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে, যা তাদের কোচিং সেন্টারের 'নিশ্চিত জিপিএ'র হাতছানির দিকে প্রলুব্ধ করে থাকে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার মূল্যায়নের এই অন্ধকার দিকটি দূর করে মেধার এক প্রকৃত, বৈজ্ঞানিক ও সর্বজনীন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির এই অন্তর্ভুক্তি কেবল সময় বাঁচাবে না, বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। নিরপেক্ষ মূল্যায়নই হবে শিক্ষার্থীদের মনে বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান হাতিয়ার এবং মেধা যাচাইয়ের শ্রেষ্ঠতম উপায়।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ৩৫ লক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের পুনর্বাসন
দ্রব্যমূল্যের বর্তমান ঊর্ধ্বগতির সাথে সংগতি রেখে শিক্ষকদের বেতন স্কেল নির্ধারিত না হলে তাদের কাছ থেকে শতভাগ একাগ্রতা ও দেশপ্রেম আশা করা অসম্ভব। উন্নত বিশ্বের ন্যায় শিক্ষকদের জন্য একটি 'স্বতন্ত্র বেতন কমিশন' গঠন করে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষক যখন আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকবেন, তখনই তিনি পূর্ণ মেধা ও মনোযোগ দিয়ে আধুনিক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে পারবেন। অন্যদিকে, কোচিং বাণিজ্যের সাথে যুক্ত প্রায় ৩৫ লক্ষ ফ্রিল্যান্সারের দক্ষতাকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করতে একটি 'জাতীয় টিউটর ডাটাবেজ' তৈরি করা প্রয়োজন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মহীন না করে তাদের দক্ষতা অনুযায়ী প্রতিটি স্কুলে বিশেষায়িত 'স্কিল ল্যাব' বা 'আফটার স্কুল সাপোর্ট' সেন্টারে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এতে করে যেমন মেধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে, তেমনি দেশের শিক্ষিত বেকার সমস্যারও এক স্থায়ী ও টেকসই সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারগুলো যদি বন্ধ হয়, তবে এই দক্ষ জনবলকে সরকারি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজে লাগানোই হবে দূরদর্শিতা। জীবনমুখী শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য এই তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের আইটি জ্ঞান ও সৃজনশীলতা স্কুলগুলোতে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আসতে পারে। সরকার যদি তাদের পুনর্বাসনে একটি মানবিক ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে তারা আন্দোলনের পরিবর্তে সরকারের সহযোগী শক্তিতে পরিণত হবে। শিক্ষকদের মর্যাদা ও ফ্রিল্যান্সারদের কর্মসংস্থানের এই ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই গড়ে তুলবে আমাদের আগামীর সমৃদ্ধ ও জ্ঞাননির্ভর সোনার বাংলাদেশ।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঘোষণাটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং আধুনিক প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের এক অপূর্ব ও নিখুঁত সমন্বয়। জেন-জেড প্রজন্মের চাহিদানুযায়ী শ্রেণিকক্ষে ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল বোর্ড স্থাপন এবং এআই-এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হবে আধুনিক বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের মূল ভিত্তি। বাণিজ্যিক শিক্ষার বিনাশ ঘটিয়ে আমাদের এমন এক ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে যেখানে শিক্ষা হবে মুক্তির সূর্য—কোনো পণ্য বা বাণিজ্যের হাতিয়ার নয়। আমলাতন্ত্রের মন্থর গতি কাটিয়ে শিক্ষকদের হাতে শিক্ষার নেতৃত্ব তুলে দিলেই রবীন্দ্রনাথের সেই আনন্দময় ও স্বাধীন শিক্ষার স্বপ্ন সার্থক হবে। ৩৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান ও ৩ কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একটি সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানভিত্তিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবি। আধুনিক প্রযুক্তি, মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবনমুখী শিক্ষার মেলবন্ধনেই গড়ে উঠবে একটি কোচিংমুক্ত, প্রগতিশীল ও উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ। আমরা সেই আগামীর অপেক্ষায় যেখানে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে এক একটি প্রজ্ঞা-তীর্থ এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী হবে এক একজন আলোকিত মানুষ।
> তত্ত্ব ও তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শিক্ষার হেরফের' প্রবন্ধের মূল সুর এবং আধুনিক জীবনমুখী শিক্ষা দর্শনের সমন্বয়ে এই রচনার সমাপ্তি টানছি। (সূত্র: এনসিটিবি ও বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ)।