ফোরাতুন্নাহার প্যারিস:উত্তরের জনপদে এক অবিনাশী রাজনীতির অগ্নিশিখা-
সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট : মোঃ সাইফুল ইসলাম এম.এ (ফিলোসোফি)
মোবাইলঃ 01714339019
----------------------------------------------------------------
ঠাকুরগাঁও থেকে বিএনপির রাজপথের লড়াকু সৈনিক, ফ্যাসিষ্ট হাসিনার আতংক, অগ্নিকন্যা ফোরাতুন্নাহার প্যারিস ।
ভূমিকা: ঝড়ের মুখে অকম্পিত দীপশিখা বাংলার উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জনপদ ঠাকুরগাঁও যখন রাজনৈতিক কুয়াশায় আচ্ছন্ন, তখন এক মহীয়সী নারীর তেজোদীপ্ত পদভারে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। তিনি ফোরাতুন্নাহার প্যারিস। রাজনীতির পিচ্ছিল আঙিনায় তিনি কেবল এক নাম নন, বরং এক জীবন্ত ইতিহাস। তুষারশুভ্র হিমালয়ের পাদদেশে বয়ে চলা টাঙ্গন নদীর মতো তার ধৈর্য যেমন অসীম, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠস্বর কালবৈশাখীর রুদ্রমূর্তির মতো প্রলয়ঙ্করী। গত তিন দশকের রাজনৈতিক কণ্টকাকীর্ণ পথে তিনি যে আলপনা এঁকেছেন, তা আজ বিএনপির রাজনীতির এক অমূল্য পাণ্ডুলিপি।
উত্তরাধিকার ও শেকড়ের ঘ্রাণ: অভিজাত্যের আভিজাত্য পঞ্চগড়ের আটোয়ারীর পুণ্যভূমিতে যে বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল, আজ তা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারের রক্ত যার ধমনীতে বহমান, তার চরিত্রে আভিজাত্য কোনো অলংকার নয়, বরং এক স্বভাবজাত জ্যোতি। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি সোপান—রুহিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ হয়ে রংপুরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পর্যন্ত—তার মেধার যে স্ফুরণ ঘটেছে, তা তাকে এক বিদুষী নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তুলেছে। তিনি কেবল এক জন শিক্ষিকা নন, তিনি এক জন আদর্শ গড়ার কারিগর, যিনি সংসার, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান আর রাজপথের স্লোগানকে এক অনন্য সুতায় গেঁথেছেন।
সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষা: কণ্টকশয্যায় কুসুমিত যাত্রা ১৯৯৩ সাল। যখন রাজনীতির আকাশ ছিল ঘনঘটাচ্ছন্ন, তখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো দিকপালদের প্রেরণায় তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন ধানের শীষের নিশান। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি এক অবিচল অভিযাত্রী। ক্ষমতার মোহ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারেনি, বরং শোষণের তপ্ত রোদ তাকে আরও উজ্জ্বল করেছে। আওয়ামী শাসনের সেই দীর্ঘ কালবেলায় যখন রাজনৈতিক আকাশ ছিল বজ্রপাতে বিদীর্ণ, তখন তিনি ছিলেন এক অপরাজেয় ফিনিক্স পাখি। হামলা, মামলা আর হুলিয়া ছিল তার নিত্যদিনের ভূষণ। ২০১৭ সাল থেকে জেলা মহিলা দলের কাণ্ডারি হিসেবে তিনি যে তরণী বাইছেন, তা আজ হাজারো কর্মীর শেষ আশ্রয়স্থল।
রূপকধর্মী আত্মত্যাগ: ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত পূর্ণিমা তার রাজনৈতিক জীবন যেন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি ও বীরত্বের সংমিশ্রণ। ২০১৩-১৪ সালের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যখন চারিদিকে ছিল বারুদের গন্ধ, তখন তিনি আত্মগোপনের আঁধারে থেকেও জ্বেলেছেন আশার প্রদীপ। তার স্বামী, সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুস আলীর ওপর নেমে আসা জুলুমের খড়্গ আর দেবর অধ্যাপক সৈয়দ আলীর বঞ্চনা—সবই ছিল তার আদর্শিক যুদ্ধের একেকটি ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু সেই ক্ষতগুলোই আজ তার শ্রেষ্ঠ মেডেল। ২৮ অক্টোবরের সেই বিষাক্ত বিকেলে যখন ঢাকার আকাশ টিয়ার গ্যাসে ধূসর, তখন তার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। সেই রক্ত কেবল রক্ত নয়, তা ছিল গণতন্ত্রের মন্দিরে এক নিবেদিত অর্ঘ্য।
তৃণমূলের স্পন্দন ও হাই কমান্ডের প্রতি আকুলতা ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি ঘাসফুল আজ ফোরাতুন্নাহার প্যারিসের নাম জপে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাকে দেখেন এক মমতাঘেরা ছায়া হিসেবে। তিনি যেন সেই বটবৃক্ষ, যার শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত কিন্তু যার শীর্ষ ছুঁতে চায় আকাশের নীলিমা। আজ যখন সংরক্ষিত নারী আসনের প্রশ্ন আসে, তখন হাই কমান্ডের দূরবীক্ষন যন্ত্র দিয়ে যদি ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে তাকানো হয়, তবে একটি মুখই ভেসে উঠবে যা রৌদ্রদগ্ধ কিন্তু ক্লান্তিহীন।
হে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, যারা রাজনীতির দাবার ছক নয়, বরং হৃদয়ের স্পন্দন বোঝেন—আপনারা দেখুন এই লড়াকু সৈনিককে। তিনি কোন পদের প্রার্থী নন, তিনি সম্মানের দাবিদার। তিনি সেই সলতে, যা জ্বলে জ্বলে নিজেকে শেষ করলেও অন্ধকার তাড়াতে পিছপা হয় না। তাকে যোগ্য সম্মান দেওয়া মানে কেবল এক জন ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করা নয়, বরং ৩০ বছরের দীর্ঘ ত্যাগ ও তিতিক্ষাকে রাজমুকুট পরানো।
উপসংহার: ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা ফোরাতুন্নাহার প্যারিস কোনো ক্ষণস্থায়ী উল্কা নন, তিনি এক স্থির নক্ষত্র। রাজনীতির এই অসম যুদ্ধে তিনি এক জন সেনাপতি, যার বর্মে রয়েছে হাজারো ত্যাগের দাগ। তৃণমূলের এই আকুতি আজ ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে। কোন অলংকৃত চেয়ারটি যদি তার মতো এক জন বিদুষী ও ত্যাগী নেত্রীর স্পর্শ পায়, তবে গণতন্ত্রের সংগ্রাম আরও বেগবান হবে। কারণ, তিনি কেবল রাজপথের নেত্রী নন, তিনি আমাদের অধিকার আদায়ের এক অবিনাশী কবিতা।