
মির্জা আব্বাস (জন্ম: ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫১) বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ও জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সমাজসেবক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে তিনি সুদীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রীর পদমর্যাদায়) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সফল সংগঠক, অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র, সাবেক মন্ত্রী এবং স্বনামধন্য উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর দীর্ঘ পথচলা অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময়।

১. প্রাথমিক জীবন ও কৈশোর (জন্ম ও শৈশব)
জন্ম ও ব্যাকগ্রাউন্ড: মির্জা আব্বাস ১৯৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুর রাজ্জাক ও মাতা কমলা খাতুন। তিনি পুরান ঢাকার এক অভিজাত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে বেড়ে ওঠেন।
কৈশোর ও সামাজিক পরিবেশ: পুরান ঢাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের সংগে নিবিড়ভাবে মিশতে পেরেছেন। শৈশব ও কৈশোরেই তিনি প্রতিవేశীদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়ে নেতৃত্বের গুণাবলি প্রদর্শন করেন। পুরান ঢাকার বিশেষ সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্য তাঁর মানসিক গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
২. শিক্ষাজীবন
মির্জা আব্বাস তাঁর শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন:
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক: ঢাকার স্থানীয় স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন।
উচ্চশিক্ষা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়): তিনি দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য অনুষদে (Commerce Faculty) কৃতিত্বের সাথে স্নাতক (B.Com) ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতি এবং জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন।
৩. ব্যবসায়ী ও ব্যাংকিং সেক্টরে উদ্যোগ
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও মির্জা আব্বাস একজন সফল উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী:
ব্যবসায়িক পদার্পণ: শিক্ষাজীবন শেষে তিনি তাদের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘মির্জা এন্টারপ্রাইজ’-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ঢাকা ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা (উদ্যোক্তা): ১৯৯৫ সালে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘ঢাকা ব্যাংক পিএলসি’ (Dhaka Bank PLC) প্রতিষ্ঠা ও এর মূল উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৫ সালের ২৯ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে যুক্ত হন। দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে।
৪. সমাজসেবা, শিক্ষাউন্নয়ন ও বিপুল কর্মসংস্থান
জনকল্যাণ এবং যুবসমাজের উন্নয়নমূলক কাজে মির্জা আব্বাসের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
নারীশিক্ষার প্রচার: ১৯৮০ সালে পুরান ঢাকার শাহজাহানপুরে নারীশিক্ষার প্রসার ও বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মির্জা আব্বাস মহিলা কলেজ’। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার নারী শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি (২২,০০০+ তরুণ-তরুণী): একজন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি তাঁর বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগ, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং সমাজসেবামূলক প্রজেক্টের মাধ্যমে আনুমানিক ২২,০০০-এর বেশি ছাত্র-ছাত্রী ও যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। শিক্ষিত তরুণ সমাজকে স্বাবলম্বী করা এবং বেকারত্ব দূরীকরণে তাঁর এ সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড প্রশংসিত।
৫. রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ও ছাত্র রাজনীতি
ছাত্র রাজনীতি: ষাটের দশকের শেষভাগ এবং সত্তরের দশকের শুরুতে তিনি সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। তৎকালীন সময়ের প্রধান প্রধান গণআন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।
বিএনপিতে যোগদান: ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন, তখন থেকে মির্জা আব্বাস জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন।
ঢাকা মহানগরের রাজনীতি: পুরান ঢাকা তথা সমগ্র ঢাকা মহানগরে দলের ভিত্তি মজবুত করতে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে কঠোর পরিশ্রম করেন।
৬. ঢাকার মেয়র ও প্রথম সারির নেতৃত্ব
১৯৯০-এর দশকে মির্জা আব্বাস বিএনপি রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হন।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র (১৯৯১-১৯৯৪): ১৯৯১ সালে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর মির্জা আব্বাস অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।
উন্নয়নমূলক কাজ: মেয়র থাকাকালীন তিনি ঢাকার আধুনিকায়ন, রাস্তাঘাট সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়ে তোলার জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। পুরান ঢাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সমস্যা দূরীকরণে তাঁর উদ্যোগ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
৭. সংসদ সদস্য, মন্ত্রীত্ব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা
মির্জা আব্বাস বেশ কয়েকবার জাতীয় সংসদের সদস্য (MP) নির্বাচিত হয়েছেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী পদে নিয়োজিত রয়েছেন:
সংসদ সদস্য: ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা থেকে সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন।
প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী: * ১৯৯১ সালে অল্প সময়ের জন্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ সালে ভূমিসচিব ও গৃহায়ন মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার চারদলীয় জোট সরকারে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Housing and Public Works) দায়িত্ব সামলান।
অবকাঠামো উন্নয়ন: মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি উত্তরা, পূর্বাচল ও ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পের কাজে গতি আনেন এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য অসংখ্য বহুতল ভবন নির্মাণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রীর পদমর্যাদা): রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে এবং তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন।
৮. বিরোধী দলীয় রাজনীতি, সংগ্রাম ও কারাবরণ
২০০৬ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মির্জা আব্বাসকে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়।
জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য: রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’-র জ্যেষ্ঠ সদস্য করা হয়।
রাজপথের আন্দোলন ও কারাবাস: ২০০৭ সালের ১/১১ সরকার এবং ২০০৯-২০২৪ সময়কালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি অসংখ্য রাজনৈতিক মামলার মুখোমুখি হন এবং একাধিকবার গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন।
দৃঢ় নেতৃত্ব: জেল-জুলুম ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি দলের নেতাকর্মীদের সার্বিক অভিভাবকত্ব প্রদান করেন।
৯. বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও ২০২৬ পর্যন্ত পথচলা
গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়া শেষে মির্জা আব্বাস রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক পরামর্শ প্রদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
অভিজ্ঞতার প্রতীক: প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় পরামর্শ প্রদান করার পাশাপাশি তিনি বিএনপির অন্যতম শীর্ষ অভিভাবক হিসেবে নতুন প্রজন্মের নেতাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।